(প্রসঙ্গ-চীন,তুরষ্ক,পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ)
সাইফুল খান
বিশ্ব রাজনীতির চাকা যখন অপ্রত্যাশিত গতিতে ঘুরছে। বাণিজ্যের মেরু যখন স্থানান্তরিত হচ্ছে। ঠিক তখনই বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক দূরদর্শী সন্ধিক্ষণে। পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশটির সামনে এখন এক সুবর্ণ সুযোগ। চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার। এটি কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং আমাদের জাতীয় ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গতিশীল ক্যানভাস।
চীন: উন্নয়নের ইঞ্জিন, প্রযুক্তির মহাস্রোত
চীনের কথা বললেই আমরা বুঝি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী উন্নয়ন-যন্ত্রকে। এটি এমন এক দেশ, যে দারিদ্র্যকে পরাস্ত করে অর্থনীতিকে রূপ দিয়েছে বৈশ্বিক প্রভাবের কেন্দ্রে। প্রযুক্তিকে করেছে রাষ্ট্রীয় কৌশলের মূল স্তম্ভ এবং অবকাঠামো নির্মাণকে পরিণত করেছে নিখুঁত দক্ষতার শিল্পে। দ্রুতগতির রেল, স্মার্ট শহর, বিশাল বন্দর ও শক্তিশালী শিল্পচেইনের মাধ্যমে চীন দেখিয়েছে উন্নয়ন কেবল স্বপ্ন নয়, সঠিক পরিকল্পনায় তা বাস্তবতা। বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক ইতোমধ্যেই অনেক দুর এগিয়েছে। সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যোগাযোগ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল, এই সহযোগিতা আজ দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। এসব প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গতি এনেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু কংক্রিট আর ইস্পাতেই থেমে থাকবো?
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে হলে আমাদের দৃষ্টি ঘোরাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। উচ্চপ্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে। চীনের ডিজিটাল সিল্ক রোড উদ্যোগে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে। কেবল গ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং এক সক্রিয় ও দক্ষ অংশীদার হিসেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা, স্মার্ট এগ্রিকালচার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি এই খাতগুলোতেই আগামী বিশ্বে প্রতিযোগিতার ময়দান নির্ধারিত হবে। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন ও গবেষণায় চীন হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর সহযোগী।
আমাদের তরুণ প্রজন্মই এই সম্পর্কের প্রকৃত বিনিয়োগ। চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তি বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণা ও ইনোভেশন সেন্টার স্থাপন, শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ এবং উচ্চশিক্ষায় চীনা ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে উৎসাহিত করা। এসব উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে কূটনৈতিক স্তর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে জ্ঞান ও সক্ষমতার স্তরে। তখন সম্পর্ক হবে কেবল রাষ্ট্রের নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের।
তবে উন্নয়নের ঝলকানিতে অন্ধ না হয়ে আমাদের এগোতে হবে সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী পায়ে। প্রতিটি প্রকল্পে অর্থনৈতিক টেকসই, ঋণঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সিদ্ধান্ত হবে আমাদের প্রয়োজন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে। কোনো চাপ বা মোহের বশে নয়। আমরা চাই সহযোগিতা, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়; চাই অংশীদারিত্ব, কিন্তু নির্ভরশীলতা নয়। উন্নয়ন হবে আমাদের নিজের পথচলায়, চীন থাকবে সেই যাত্রার শক্তিশালী সহযাত্রী, চালক নয়।
তুরস্ক: সাংস্কৃতিক সেতু, প্রতিরক্ষার কৌশলগত মিতালি
বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নথিতে জন্ম নেয়নি। এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ইতিহাস, আবেগ ও পারস্পরিক মর্যাদার দীর্ঘ প্রবাহে। উসমানীয় খিলাফতের যুগ থেকে শুরু করে উপমহাদেশের মুসলমানদের স্বাধীনতা-চেতনা পর্যন্ত। তুরস্ক বাংলার মানুষের কাছে ছিল শক্তি, আত্মমর্যাদা ও নেতৃত্বের প্রতীক। সেই স্মৃতি আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। তবে আবেগের এই উত্তরাধিকারকে এখন সময়ের দাবি অনুযায়ী রূপ দিতে হবে বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে।
একবিংশ শতাব্দীতে তুরস্ক নিজেকে প্রমাণ করেছে একটি উদীয়মান প্রতিরক্ষা শক্তি হিসেবে। ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্কের বিপ্লব, নৌযান নির্মাণে স্বনির্ভরতা, আধুনিক ইলেকট্রনিক ও সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থায় অগ্রগতি। এসবই দেখায় কীভাবে একটি দেশ ধাপে ধাপে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ–তুরস্ক যৌথ উদ্যোগে ড্রোন, নৌযান, হালকা ও ভারী সামরিক যান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে তা শুধু সক্ষমতা বৃদ্ধি নয় বরং প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার পথে এক কৌশলগত অগ্রগতি হবে।
তবে সম্পর্কের ভিত্তি কেবল অস্ত্র ও নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তুরস্কের শক্তিশালী সফট পাওয়ার। ইতিহাস, স্থাপত্য, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও পর্যটন এর সাথে বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য, সংগীত, নদীমাতৃক সংস্কৃতির মেলবন্ধন গড়ে তুলতে পারে এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংলাপ। তুরস্কে বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপস্থিতি, আর বাংলাদেশে তুরস্কের সভ্যতা ও শিল্পকলার পরিচয়, এই বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তৈরি হতে পারে নতুন প্রজন্মভিত্তিক সম্পর্কের ভিত্তি।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। ঐতিহাসিক ইসলামি ঐতিহ্য, চিকিৎসা পর্যটন, শিক্ষামূলক ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ–তুরস্কের মধ্যে একটি দ্বিমুখী পর্যটন করিডোর গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থানকারী তুরস্ক হতে পারে বাংলাদেশের পণ্য, পোশাক, ওষুধ ও সেবার জন্য একটি কৌশলগত লজিস্টিক বাজার এবং প্রবেশদ্বার। এই সংযোগ কেবল বাণিজ্য বাড়াবে না। বাংলাদেশকে আরও দৃঢ়ভাবে ইউরো–এশীয় অর্থনৈতিক প্রবাহের সাথে যুক্ত করবে।
সব মিলিয়ে, তুরস্ক আমাদের কাছে কেবল এক ঐতিহাসিক বন্ধু নয়। বরং এমন এক অংশীদার, যার সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে শক্তি ও সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্য, বাস্তবতা ও আদর্শের ভারসাম্যে। অতীতের আবেগকে পুঁজি করে, বর্তমানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ করেই বাংলাদেশ–তুরস্ক সম্পর্ককে নিয়ে যেতে হবে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায়।
পাকিস্তান: ইতিহাসের জট খোলা, ভবিষ্যতের দিকে হাত বাড়ানো
ইতিহাসের তিক্ততা মুছে ফেলা যায় না, আবার তা অস্বীকার করেও সামনে এগোনো সম্ভব নয়। কিন্তু কূটনীতির মূল দর্শন হলো অতীতের সত্যকে স্বীকার করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ। বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে। এখন সময় এসেছে আবেগ ও অস্বীকারের দ্বন্দ্ব পেরিয়ে বর্তমানের চাহিদা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে একটি বাস্তববাদী নতুন অধ্যায় লেখার।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা হতে পারে এই নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি। দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় বাজার হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত। এই মাসে দুই দেশের ভিতর বিমান চলাচল আবার শুরু হচ্ছে। এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া পাকিস্তানের শিল্প ও ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, সিরামিক, প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের কৃষিপণ্য, ফলমূল, তুলা, চাল এবং হালাল মাংস বাংলাদেশের বাজারে বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে ধাপে ধাপে একটি মুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে উভয় দেশের অর্থনীতিই পাবে নতুন গতি, আর ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাজনৈতিক উত্তাপের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
তবে সম্পর্ক কেবল পণ্যের বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাংস্কৃতিক বিনিময়ই মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব ঘোচানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র ও খেলাধুলার মাধ্যমে দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা জরুরি। উর্দু ও বাংলা সাহিত্যের পারস্পরিক অনুবাদ প্রকল্প, যৌথ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা, ক্রিকেট ও অন্যান্য ক্রীড়ায় বন্ধুত্বমূলক সিরিজ এবং শিক্ষার্থী ও গবেষক বিনিময় কর্মসূচি। এসব উদ্যোগ ইতিহাসের ভারকে হালকা করে ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টি ফেরাতে সহায়ক হতে পারে।
নিরাপত্তা সহযোগিতাও এই সম্পর্কের একটি বাস্তব প্রয়োজন। সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, মানবপাচার ও সাইবার অপরাধ এই চ্যালেঞ্জগুলো কোনো সীমান্ত মানে না। তাই তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ দুই দেশেরই স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা হতে হবে স্বচ্ছ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। যাতে আস্থার সংকট নয়, বরং ধীরে ধীরে বিশ্বাসের কাঠামো গড়ে ওঠে।
সবশেষে, বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সাহসী বাস্তববাদে। অতীতের দায় স্বীকারের নৈতিকতা, বর্তমানের লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার স্বার্থ। এই তিনের ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে হবে।
ত্রি-মুখী কৌশল: বাংলাদেশের নিজস্ব পথচলার নকশা
চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন শক্তি ও ভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থানসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিজস্ব বৈদেশিক দর্শন । “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়”। এটি কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি পরীক্ষিত কৌশল, যা বাংলাদেশকে পরাশক্তির সংঘাতের বাইরে রেখে ধাপে ধাপে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। এই দর্শনের ভিত্তিতেই আমাদের কূটনীতি হতে হবে বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সর্বোপরি স্বার্থনির্ভর।
প্রথমত, আমাদের কূটনীতির অগ্রভাগে থাকতে হবে অর্থনীতি। আদর্শের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে সক্ষমতার উপর। প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কে আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট হতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশকে একটি অপরিহার্য সংযোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অবকাঠামো, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ। এই খাতগুলোতে কূটনীতি ও অর্থনীতিকে একই সুতোয় বাঁধতে পারলেই সম্পর্ক হবে ফলপ্রসূ।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র-থেকে-রাষ্ট্র কূটনীতির পাশাপাশি আমাদের জোর দিতে হবে মানুষ-থেকে-মানুষ সংযোগে। সাংস্কৃতিক কূটনীতি কোনো আলঙ্কারিক বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ভিত্তি। শিক্ষা, পর্যটন, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা এবং প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ভেঙে পড়ে না। তাই শিক্ষার্থী ও গবেষক বিনিময়, যৌথ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এবং মিডিয়া ও শিল্পকলার সহযোগিতাকে কূটনীতির মূলধারায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, সময় এসেছে জ্ঞানভিত্তিক কূটনীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। প্রতিটি দেশের ইতিহাস, শক্তির কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, ভাষা ও সংস্কৃতি এসব নিয়ে গভীর গবেষণা ছাড়া আধুনিক কূটনীতি কার্যকর হয় না। থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ একাডেমি ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত গবেষণা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনাই হতে হবে আমাদের দিকনির্দেশক।
এই ত্রি-মুখী কৌশলের সারকথা একটাই। বাংলাদেশ কারো বলয়ের অংশ নয়, বরং নিজের স্বার্থ ও সক্ষমতা দিয়ে নিজস্ব পথচলার এক আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র। বন্ধুত্ব হবে সবার সাথে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে ঢাকার। সহযোগিতা হবে বহুমুখী, কিন্তু দিকনির্দেশ থাকবে জাতীয় স্বার্থে। এই ভারসাম্য রক্ষা করতেই বাংলাদেশের কূটনীতি আগামী দিনে আরও পরিণত, আরও প্রাসঙ্গিক এবং আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
পরিশেষ
বাংলাদেশ আজ আর সম্ভাবনার প্রতীক্ষায় থাকা কোনো রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ আজ এক আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও দায়িত্বশীল জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার আমাদেরকে এক অনন্য কূটনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। এই অর্জন কেবল পরিসংখ্যানের নয়; এটি আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতিফলন।
এই প্রেক্ষাপটে চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে আমাদের নিজস্ব জাতীয় চরিত্রের আলোকে। যে চরিত্র স্বাধীনচেতা, বাস্তববাদী ও সুপরিকল্পিত। সহযোগিতা হবে প্রয়োজনভিত্তিক, অংশীদারিত্ব হবে সমতার ভিত্তিতে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে অগ্রাধিকার পাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ।
সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মান। এই নীতিই হবে আমাদের কূটনৈতিক নোঙর। আমরা কারো বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হব না, আবার কাউকে দূরে ঠেলে দেবও না। আমরা কথা বলব আত্মবিশ্বাসের সাথে, দরকষাকষি করব সক্ষমতার ভিত্তিতে এবং সহযোগিতা গ্রহণ করব আমাদের নিজস্ব উন্নয়নপথের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। এভাবেই বাংলাদেশ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে এক দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে। যে শক্তি সংঘাত নয়, সমাধানের অংশ হতে চায়।
আজকের সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকে। তাই এই মুহূর্ত আমাদের কাছে কেবল নীতিগত নয়, ঐতিহাসিক দায়িত্বও বটে। আসুন, আমরা সমষ্টিগত প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে গড়ে তুলি এক উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের ভিত্তি। যেখানে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে মর্যাদাপূর্ণ, পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সম্ভাবনাময় বিশ্বের পথপ্রদর্শক।
লেখক-ইতিহাস,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
