নয়াখবর
সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চমস্কিপন্থী সমাজতন্ত্রের একটি ব্যবচ্ছেদ: লাল আমলাতন্ত্র ও খোদায়ী অঙ্গীকার

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬ ৩:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত

 

সংজ্ঞার বিভ্রান্তি:সমাজতন্ত্রের বিপরীত প্রতিচ্ছবি হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র: নোয়াম চমস্কি মনে করেন, সোভিয়েত রাষ্ট্রকে ‘সমাজতন্ত্রের’ সাথে গুলিয়ে ফেলা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সফল প্রোপাগান্ডা, যা দুটি বিপরীত মেরুর শক্তি মিলে তৈরি করেছে। একদিকে সোভিয়েত শাসকরা তাদের ‘লাল আমলাতন্ত্রকে’ বৈধতা দিতে এই লেবেলটি ব্যবহার করত। অন্যদিকে, পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা এই একই লেবেল ব্যবহার করে নিজেদের জনগণকে সমাজতন্ত্রের ভয় দেখাত; তাদের দাবি ছিল বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে পা রাখলেই ‘সোভিয়েত কারাগারের’ মতো দুর্দশা অবধারিত (Chomsky, 1986)। চমস্কির মতে, লেনিন ও ট্রটস্কি যে ব্যবস্থা গড়েছিলেন তা সমাজতন্ত্রের কোনো ত্রুটিপূর্ণ সংস্করণ নয়, বরং এর সরাসরি বিপরীত এক রূপ। যদি সমাজতন্ত্র মানে হয় ‘উৎপাদনের ওপর উৎপাদকের কর্তৃত্ব’, তবে বলশেভিকরা ফ্যাক্টরি কমিটিগুলো ভেঙে দিয়ে আসলে বিপ্লববিরোধী কাজই করেছিল (Carr, 1952)।

রাষ্ট্রীয় পুরোহিত এবং ক্ষমতার বিকৃতি: চমস্কির যুক্তির একটি প্রধান স্তম্ভ হলো ‘নতুন শ্রেণির’ বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, যাদের তিনি ‘রাষ্ট্রীয় পুরোহিত’ বলে ডাকেন। এরা সাধারণ মানুষের স্লোগান ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং পরে সেই মানুষের ওপরই একটি প্রোটো-ফ্যাসিস্ট কাঠামো চাপিয়ে দেয়। লেনিনবাদ এবং পশ্চিমা ব্যবস্থাপকতন্ত্র উভয়ই একটি অভিজাততান্ত্রিক দর্শনে বিশ্বাসী: “গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেবল শীর্ষস্তরেই থাকা উচিত” (McNamara, 1968)।

চমস্কি লেনিনবাদীদের সেই ‘তীব্র অবজ্ঞা’র সমালোচনা করেন, যেখানে তারা শ্রমিকদের স্বকীয় চিন্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল কঠোর শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করে। বাকুনিন ও রোজা লুক্সেমবার্গ যেমনটি আশঙ্কা করেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের সুযোগ ছাড়া পার্টির শাসন অনিবার্যভাবে একটি আমলাতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রে রূপ নেয় (Bakunin, 1873; Luxemburg, 1918)।

লেনিনবাদ যখন সমাজতন্ত্রকে ‘রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করল, তখন বুদ্ধিজীবীদের জন্য বিপ্লবী কমিউনিজম থেকে পশ্চিমা ক্ষমতার গুণগানে রূপান্তর হওয়া খুব সহজ হয়ে গেল।

ইসলামি সমালোচনা: বস্তুবাদের ঊর্ধ্বে সার্বভৌমত্ব: ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনের প্রেক্ষাপটে চমস্কির সোভিয়েত সমালোচনা বুদ্ধিদীপ্ত হলেও তা একটি সেকুলার-বস্তুবাদী গণ্ডির মধ্য

ইসলামি দর্শনে নিপীড়নের মূল কারণ কেবল একটি ‘ব্যবস্থাপক শ্রেণি’র উপস্থিতি নয়, বরং মানুষের দ্বারা ‘হাকিমিয়্যাহ’ (Divine Sovereignty) বা খোদায়ী সার্বভৌমত্ব হরণ করা। কুরআন ঘোষণা করে, “বিধান দেবার অধিকার কেবল আল্লাহরই” (১২:৪০)। যখন কোনো রাষ্ট্র মানুষের জীবনের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব দাবি করে, তখন তা রাজনৈতিকভাবে ‘শিরক’ বা আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করার নামান্তর। তাই সোভিয়েত ‘কারাগার’ কেবল শ্রমিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের ‘ফিতরাত’ (innate nature) বুঝতে একটি পরাজ্ঞানীয় ব্যর্থতা।

জ্ঞানতাত্ত্বিক সমালোচনা: আধুনিকতা ও ‘অসম্ভব রাষ্ট্র’: এই সমালোচনাকে আরও বিস্তৃত করে ওয়ায়েল হাল্লাক যুক্তি দেন যে, চমস্কির বিশ্লেষণ আধুনিক রাষ্ট্রের সেই ‘এনলাইটেনমেন্ট’ কাঠামোর মধ্যেই বন্দি যা এই সোভিয়েত দানব তৈরি করেছিল। হাল্লাকের মতে, ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ তার চরিত্রগত কারণেই একটি আধিপত্যকামী যন্ত্র। সে নিজেকে পুঁজিবাদী বলুক আর সমাজতন্ত্রী। তিনি মনে করেন আধুনিক বিশ্বে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ একটি ‘অসম্ভব’ ধারণা, কারণ আধুনিক রাষ্ট্র এমন এক সার্বভৌমত্ব দাবি করে যা সরাসরি খোদায়ী কর্তৃত্বের সাথে সাংঘর্ষিক (Hallaq, 2013)। রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে কোনো নৈতিক আইন (শরিয়াহ) না থাকলে যেকোনো মানবীয় ব্যবস্থাপনাই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার লালসার শিকারে পরিণত হবে।

নৈতিক সার্বভৌমত্ব বনাম বস্তুগত স্বায়ত্তশাসন:
দার্শনিক ত্বহা আবদুর রহমান আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের ‘নৈতিক দারিদ্র্যের’ দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত মুক্তি কেবল উৎপাদনের ওপর মালিকানা নয়, বরং ‘নৈতিক সার্বভৌমত্ব’। সোভিয়েত ব্যর্থতার মূলে ছিল তাদের ‘সেকুলার অভিভাবকত্ব’, যেখানে মানুষ খোদায়ী রেফারেন্স ছাড়াই নিজেদের নৈতিকতার মাপকাঠি বানিয়ে নিয়েছিল (Abdurrahman, 2006)। চমস্কি মানুষের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের কথা বললেও ত্বহা আবদুর রহমান মনে করেন, মানুষ যতক্ষণ খোদায়ী অঙ্গীকারের (Divine Covenant) সাথে যুক্ত না হয়, ততক্ষণ সে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন পায় না।এই আধ্যাত্মিক সংযোগ ছাড়া চমস্কির ‘মুক্তি’ মানুষকে এক প্রভুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নতুন কোনো ‘সেকুলার’ প্রভুর দাসে পরিণত করে।

ন্যায়বিচার (আদল) বনাম নিরঙ্কুশ স্বায়ত্তশাসন: সামাজিক শৃঙ্খলার প্রকৃতি নিয়ে চমস্কির সাথে ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। চমস্কি যেকোনো স্তরবিন্যাসকে ‘শৃঙ্খল’ মনে করলেও ইসলাম সামাজিক কাঠামোকে একটি ‘আমানত’ হিসেবে দেখে। চমস্কির এই নিরঙ্কুশ স্বায়ত্তশাসনের ধারণায় কোনো নৈতিক নোঙর নেই। যদি উৎপাদনের নীতি নৈতিকতার কোনো উর্ধ্বতন আইন দ্বারা পরিচালিত না হয়, তবে ‘শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ’ খুব সহজেই একটি গোষ্ঠীগত অহমিকা বা বস্তুবাদে রূপ নিতে পারে। আলী শরীয়তী যেমন বলেছিলেন, “অর্থনীতি লক্ষ্য নয়, বরং পথ” (Shariati, 1980)। একটি সমাজ তখনই মুক্ত যখন তা ‘আদল’ (Justice) ও ‘ইহসান’-এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়, যেখানে দুর্বলরা শক্তিশালীর হাত থেকে নিরাপদ থাকে।

ভ্যানগার্ড বনাম উলামা: প্রতিরোধের ভিন্ন বয়ান:

পরিশেষে, বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ভূমিকা নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। চমস্কি সেই ‘রাষ্ট্রীয় পুরোহিতদের’ ব্যাপারে সঠিকভাবেই সতর্ক করেছেন যারা আদর্শের দোহাই দিয়ে শাসন করে। তবে ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘উলামা’রা সম্ভাব্য এক প্রতিপক্ষ শক্তি (counter-power) হিসেবে কাজ করে। উলামাদের আদর্শিক ভূমিকা হলো শাসকের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা এবং এমন এক আইনের ভিত্তিতে সমালোচনা করা যা কোনো শাসকের তৈরি নয়। এটি লেনিনবাদী ‘কঠোর শৃঙ্খলার’ বিপরীতে একটি শক্তিশালী ‘কাউন্টার-ন্যারেটিভ’ প্রদান করে (Hallaq, 2009)। লেনিনবাদী ভ্যানগার্ড যেখানে জনতাকে ‘শাসন’ করতে চায়, সেখানে প্রকৃত ইসলামি পণ্ডিতের কাজ হলো ‘তরবিয়াহ’ (নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন), যা মানুষকে সরাসরি স্রষ্টার কাছে দায়বদ্ধ করে তোলে।

মুক্তিদাতার ছদ্মবেশে ঘাতক: এই পর্যালোচনার আলোকে দেখা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল ব্যর্থতা ছিল আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানো। যা অনিবার্যভাবে ‘মুক্তিদাতাকে’ ‘নিপীড়কে’ পরিণত করে।

চমস্কি সঠিকভাবেই বলেছেন যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে তার শত্রুদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। তবে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি বলে যে, এই মুক্তি কেবল ক্ষমতার বৈষয়িক পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে আসবে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক নৈতিক ও পরাজ্ঞানীয় কাঠামো যা মানুষের কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে।

লেখক- কবি, চিন্তক ও গবেষক।