নয়াখবর
সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্ষমতার নতুন ধমনী: বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে সংযোগের অমোঘ সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬ ১:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পেরিয়ে আমরা যখন তৃতীয় দশকে পা রাখছি। তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংজ্ঞা ও কাঠামো বদলে যাচ্ছে নাটকীয়ভাবে। ইতিহাসের দীর্ঘ অধ্যায় জুড়ে আমরা দেখেছি, সীমানা চিহ্নিত করার জন্য ছিল কামান ও অশ্বারোহী বাহিনী। এরপর এসেছিল পারমাণবিক শক্তির করাল গ্রাস। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে, যুদ্ধের ময়দান ধীরে ধীরে সরে এসেছে সম্মুখ সমর থেকে সংযোগের আঙিনায়। আজকের বিশ্বে প্রকৃত শক্তির উৎস হলো অবকাঠামো। যে ধমনীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় পণ্য, জ্বালানি, তথ্য ও প্রভাব।

অবকাঠামো এখন আর কেবল ইট-পাথরের সমষ্টি নয়; এটি একইসঙ্গে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও কূটনৈতিক হাতিয়ার। সাগরের বুকে গড়ে ওঠা নতুন বন্দর, মরুভূমির বুক চিরে এগিয়ে চলা রেললাইন, কিংবা সমুদ্রের অতলে বিছানো ফাইবার অপটিক কেবল। এগুলো এখন জাতীয় শক্তি ও সার্বভৌমত্বের ধারক। আর এই ধমনী যার নিয়ন্ত্রণে, ভবিষ্যৎ বিশ্ব ব্যবস্থায় সিদ্ধান্তের ভারসাম্য তার হাতেই নত হবে।

সংযোগের ভূ-রাজনীতি: নেপথ্যের টানাপোড়েন

ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা গাজায় ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের পাশাপাশি বিশ্ব এখন প্রত্যক্ষ করছে একটি নীরব, কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতা। এটি হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) যুদ্ধ। কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে যখন প্রতিটি দেশ টের পেল, একটি অদৃশ্য ভাইরাসও কয়েক সপ্তাহে বিশ্ব বাণিজ্যের চাকা থামিয়ে দিতে পারে। তখন থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং কৌশলগত করিডোরের নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠেছে মূলমন্ত্র। যে রাষ্ট্র শত্রু দেশের ওপর নির্ভরশীলতা ছিন্ন করে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করতে পারবে, কূটনীতির দরবারে তার দর কষাকষির ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি হবে।

চীনের মহাপরিকল্পনা: বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)

এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’। প্রাচীন সিল্ক রুটের পুনর্জাগরণ ঘটানো এই প্রকল্পটি এককভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ। পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দর থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, আফ্রিকার জিবুতি থেকে গ্রিসের পিরেয়াস বন্দর। প্রায় প্রতিটি কৌশলগত বিন্দুতে চীনের ‘ঋণের ফাঁদ’ কিংবা ‘সুবর্ণ চাবি’ যাই বলা হোক, নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে।

চীনের দর্শন খুব স্পষ্ট: সামরিক ঘাঁটি না বসিয়েও, বাণিজ্যপথের ওপর এতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাতে প্রয়োজনে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক অবরোধে ফেলা যায়। ‘মুক্ত বাণিজ্য’ ও ‘যৌথ উন্নয়ন’-এর আবরণে তারা বিশ্বমানচিত্রে এক নতুন ধমনীজাল তৈরি করছে, যার কেন্দ্রে আছে বেইজিং।

পশ্চিমা জবাব: PGII থেকে IMEC

চীনের এই প্রভাব বলয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে নীতি নির্ধারণের জায়গায় অবহেলিত থাকা ‘অবকাঠামো কূটনীতি’ এখন তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে। ২০২২ সালে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ঘোষিত ‘পার্টনারশিপ ফর গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’ (PGII) তারই প্রতিফলন। পাশাপাশি, ২০২৩ সালের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ইতিহাস সাক্ষী রইল এক যুগান্তকারী চুক্তির। ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর (IMEC)।

এই করিডোর শুধু ভারত ও ইউরোপকে যুক্ত করছে না; এটি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য দ্ব্যর্থহীন: চীনের স্থলপথের ‘বেল্ট’ (সড়কপথ) এর বিকল্প হিসেবে একটি আধুনিক ও টেকসই সমুদ্র-রেল করিডোর তৈরি করা, যা হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বচ্ছ অর্থায়নের প্রতীক।

জ্বালানি ও ডিজিটাল সীমান্ত: নতুন সম্মুখযুদ্ধ

যদি সড়ক ও বন্দরগুলোকে মানবদেহের শিরা-উপশিরা বলা হয়, তবে জ্বালানি পাইপলাইন ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক হলো সেই দেহের রক্ত ও স্নায়ু। সম্প্রতি বাল্টিক সাগরে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন ধ্বংসের ঘটনা প্রমাণ করে, আধুনিক যুদ্ধে পানির নিচেও সমান তৎপরতা চলে। রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া ইউরোপকে যেমন শীতার্ত করেছে, তেমনি শিখিয়েছে জ্বালানি নির্ভরতার মূল্য।

অন্যদিকে, ডিজিটাল অবকাঠামো এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সমুদ্রের তলদেশে থাকা হাজার হাজার কিলোমিটার কেবলই বিশ্বের তথ্য প্রবাহের ধমনী। কে এই কেবল তৈরি করছে, কে তার রক্ষণাবেক্ষণ করছে এখন তা নিরাপত্তার প্রশ্ন। চীনের হুয়াওয়ে ও ইউরোপের নকিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুধু বাজারের জন্য নয়, বরং আগামী দিনের ডিজিটাল বিশ্বের স্থপতি হওয়ার লড়াই। ৫জি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সবকিছুর ভিত গড়ে ওঠে এই ডিজিটাল পরিকাঠামোর ওপর ।

উপসংহার:

বিশ্ব এখন এক অনন্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ‘অবকাঠামোগত কূটনীতি’ বা ‘সংযোগের রাজনীতি’ এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রতিযোগিতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যেমন অভাবনীয় সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে গভীর শঙ্কাও। চীন বা পশ্চিমা বিশ্বের প্রকল্পগুলোতে যুক্ত হয়ে সহসাই উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠা গেলেও, অতিরিক্ত ঋণের বোঝা বা সার্বভৌমত্বের অংশ হারানোর ঝুঁকিও থেকে যায়।

তাই ক্ষুদ্র ও মধ্যম আকারের রাষ্ট্রগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশল নির্ধারণ। তাদের চলতে হবে সাবধানে, এমনভাবে যাতে এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তারা কোনো এক শক্তির পাদানিতে পরিণত না হয়, বরং নিজেদের স্বার্থে এই ধমনীগুলোকে কাজে লাগিয়ে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। কারণ, শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বিচার করবে কারা কেবল পথ তৈরি করেছিল, আর কারা সেই পথ ধরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সভ্যতাকে।

লেখক-ইতিহাস,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।