সাইফুল খান
সাইবেরিয়ার ভ্লাদিভোস্তক সামরিক ঘাঁটি। ১৯৪১ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। সকাল থেকেই অদ্ভুত একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যারাকগুলোতে। অফিসাররা ফিসফিস করে কথা বলছিল, ম্যাপের ওপর ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছিল। সৈন্যরা বুঝতে পারছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু কী সেটা কেউ জানত না।
সার্জেন্ট ইভান কোজলভ তার স্কোয়াডের তাঁবুতে ঢুকল যখন, তখন সবাই দুপুরের খাবার খাচ্ছে। তিরিশ বছর বয়সী এই মানুষটার মুখে সবসময় একটা শান্ত ভাব থাকে। কিন্তু আজ তার চোখে কিছু একটা আলাদা দেখাচ্ছে। সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “সবাই শোনো। আমাদের পশ্চিমে যেতে হবে।”
তরুণ আলেক্সেই মাত্র আঠারো বছর বয়সে যোগ দিয়েছিল সেনাবাহিনীতে। তার হাত থেকে রুটির টুকরোটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। “পশ্চিমে মানে… মানে কি মস্কো?”
ইভান মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ফ্যাসিস্টরা আমাদের রাজধানীর দোরগোড়ায়। খবর এসেছে তারা মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। আমাদের ভাইয়েরা সেখানে প্রতিদিন হাজারে হাজারে মরছে। স্টালিন নিজে আদেশ দিয়েছেন আমাদের যেতে হবে।”
পুরো তাঁবু নিরব হয়ে গেল। সবাই জানত এর মানে কী। মস্কো মানে যুদ্ধের একদম কেন্দ্র। মস্কো মানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো।
বৃদ্ধ নিকোলাই পেট্রোভিচ, যার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও এখনো সে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। “তো শেষ পর্যন্ত সময় এলো। আমি ১৯৩৯ সালে জাপানিদের সাথে লড়েছি খালখিন গোলে। ভেবেছিলাম সেটাই আমার শেষ যুদ্ধ। কিন্তু না। মাতৃভূমি যখন ডাকে, আমরা যাই।”
সেদিন সন্ধ্যায় পুরো ঘাঁটি জুড়ে প্রস্তুতি চলছিল। অস্ত্র পরিষ্কার করা, গোলাবারুদ গোনা , শীতকালীন পোশাক বের করা চলছিল। প্রত্যেক সৈন্য জানত তাদের সামনে লম্বা একটা যাত্রা অপেক্ষা করছে। নয় হাজার কিলোমিটার! পুরো সাইবেরিয়া পাড়ি দিতে হবে।
রাত এগারোটা নাগাদ প্রথম ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে বেরোল। শত শত ওয়াগনে ঠাসা প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্য, ট্যাংক, কামান, ঘোড়া, রসদ। এক অবিশ্বাস্য সামরিক স্থানান্তর যা পৃথিবীতে খুব কমই ঘটেছে।
আলেক্সেই জানালার পাশে বসেছিল। বাইরে ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছিল। ট্রেন ধীরে ধীরে গতি বাড়াচ্ছে। তার পাশে বসেছে সেরা বন্ধু দিমিত্রি। দুজনেই একসাথে বড় হয়েছে সাইবেরিয়ার এক ছোট্ট গ্রামে। এক সাথে শিকার করতে যেত, এক সাথে স্কুলে পড়ত, এক সাথে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।
“তুই ভয় পাচ্ছিস?” দিমিত্রি জিজ্ঞেস করল।
আলেক্সেই একটু ভাবল। “হ্যাঁ। কিন্তু সেই সাথে উত্তেজনাও লাগছে। আমরা তো সারা জীবন এই মুহূর্তের জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন সময় এসেছে প্রমাণ করার।”
ট্রেন চলছিল আর চলছিল। দিন রাত মিলে গেল। বাইরে দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল অন্তহীন তাইগা বন, বরফে ঢাকা সফেদ পাহাড়, জনমানবহীন তুন্দ্রা প্রান্তর। মাঝে মাঝে ছোট্ট স্টেশনে থামত ট্রেন। সেখানে স্থানীয় মানুষেরা এসে গরম চা, রুটি দিয়ে যেত সৈন্যদের। বৃদ্ধ মহিলারা কাঁদতে কাঁদতে আশীর্বাদ করত, “ফিরে এসো বাছারা। আমাদের রাশিয়াকে বাঁচাও।”
পাঁচদিন পর ট্রেন উরাল পাহাড় পার হলো। এশিয়া থেকে এইবার ইউরোপে প্রবেশ করল। এখান থেকে শুরু হলো সত্যিকারের রাশিয়া। সৈন্যরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিল পরিচিত দৃশ্য। এই মাটির জন্যই তারা লড়তে যাচ্ছে।
দশদিন পর ট্রেন পৌঁছল মস্কোর কাছাকাছি। কিন্তু যা দৃশ্য তারা দেখল তা হৃদয় বিদারক ছিল। জ্বলন্ত গ্রাম থেকে ধোঁয়া উঠছে। পথে পথে ধ্বংসস্তূপ। শরণার্থীদের লম্বা সারি রাস্তায়। বুড়ো, বাচ্চা, মহিলারা হাঁটছে পূর্বদিকে, নিরাপদ জায়গার খোঁজে। তাদের চোখে আতঙ্ক, মুখে বেদনা।
ট্রেন থামল একটা ছোট্ট স্টেশনে। সেখানে ইতিমধ্যেই জমা হয়ে ছিল সামরিক ট্রাক, জিপ। অফিসাররা এসে সৈন্যদের নামাতে শুরু করল। কমান্ডার জেনারেল দিমিত্রি লেলিউশেঙ্কো নিজে উপস্থিত ছিলেন। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে এক অদম্য দৃঢ়তা।
“সৈনিকরা,” তিনি গর্জে উঠলেন, “তোমরা এসেছ। আমরা জানতাম তোমরা আসবে। মস্কো থেকে জার্মানরা এখন মাত্র পঁচিশ কিলোমিটার দূরে। তারা বাইনোকুলার দিয়ে ক্রেমলিনের চূড়া দেখতে পাচ্ছে। আমাদের অনেক ইউনিট প্রায় শেষ। কিছু রেজিমেন্টে মাত্র পঞ্চাশজন করে সৈন্য বেঁচে আছে। কিন্তু তোমরা এসেছ। সাইবেরিয়ার বীর সন্তানেরা। তোমরা জানো কীভাবে শীতে লড়তে হয়। আর এই শীতই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।”
সৈন্যরা ট্রাকে উঠল। তাদের নিয়ে যাওয়া হলো ফ্রন্টলাইনের কাছে। পথে যেতে যেতে তারা দেখল ভয়াবহতা। রাস্তার ধারে পড়ে আছে ধ্বংস হওয়া ট্যাংক, জ্বলে যাওয়া ট্রাক, লাশ। আকাশে মাঝে মাঝে জার্মান বোমারু বিমানের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ। তাপমাত্রা হঠাৎ করে নামতে শুরু করল। প্রথমে মাইনাস দশ, তারপর মাইনাস বিশ, তারপর মাইনাস ত্রিশ। এক ভয়াবহ শীত নামছিল রাশিয়ায়।
জার্মান সৈন্যরা কাঁপতে শুরু করল। তাদের গ্রীষ্মকালীন ইউনিফর্ম এই ঠান্ডার জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিল না। অতি আত্মবিশ্বাসী হিটলার ভেবেছিল তিন মাসেই মস্কো দখল হয়ে যাবে। তাই শীতকালীন পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়নি। এখন সেই ভুলের মূল্য দিতে হচ্ছে জার্মান সৈন্যদের।
তাদের ট্যাংকের ইঞ্জিনের তেল জমে যাচ্ছে। সকালে ট্যাংক স্টার্ট দিতে হলে আগে নিচে আগুন জ্বালিয়ে গরম করতে হচ্ছিল। রাইফেলের বোল্ট আটকে যাচ্ছে ঠান্ডায়। মেশিনগান জ্যাম হয়ে যাচ্ছে। আর সৈন্যরা নিজেরা প্রতিদিন হাজারে হাজারে হাড় জমানে হিম শীতে আক্রান্ত হচ্ছিল।
একজন জার্মান সৈন্য, প্রাইভেট হান্স মুলার; বার্লিনের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তার ডায়েরিতে লিখছিল নভেম্বরের শেষে “আজ তাপমাত্রা মাইনাস পয়ত্রিশ ডিগ্রি। আমার পায়ের আঙুলগুলো আর অনুভব করতে পারছি না। আমার বন্ধু ফ্রিটজ গতকাল রাতে ঘুমের মধ্যে মারা গেছে। জমে গিয়ে। এটা এক অভিশপ্ত দেশ! রাশিয়ায় শুধু তিনটা জিনিস আছে বলে মনে হয় -শীত, শীত আর শীত। আমরা কি কখনো বাড়ি ফিরব? মা, আমি তোমাকে আবার দেখতে চাই।”
কিন্তু সাইবেরিয়ান সৈন্যদের জন্য এই ঠান্ডা কিছুই ছিল না। তারা মাইনাস চল্লিশ পঞ্চাশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বড় হয়েছে। তাদের ছিল পুরু ভেড়ার লোমের তৈরি পোশাক, ভালিয়েংকি নামের বিশেষ বুট যা পা গরম রাখত, মোটা টুপি যা কান ঢেকে রাখত। তারা জানত কীভাবে বরফের মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ইভানের স্কোয়াডকে দেওয়া হলো একটা বিশেষ মিশন। রাতের অন্ধকারে তাদের যেতে হবে জার্মান লাইনের পেছনে। ধ্বংস করতে হবে একটা সাপ্লাই ডিপো।
সন্ধ্যা সাতটায় তারা তৈরি হতে শুরু করল। সবাই পরল সাদা শীতকালীন ক্যামোফ্লেজ। এই পোশাক পরলে তুষারের মধ্যে তাদের দেখা প্রায় অসম্ভব। পায়ে বাঁধল স্কি। হাতে নিল PPSh-41 সাবমেশিনগান। যাকে রাশিয়ায় সবাই ‘পাপাশা’ বলে ডাকত। এই রাইফেল নির্ভরযোগ্য ছিল, ঠান্ডায় দারুন কাজ করত। পিঠে ঝুলিয়ে নিল গ্রেনেড।
রাত নটায় তারা বের হলো। সেই রাতে বইছিলো ঘন তুষারঝড়। ঝড়ের তোড়ে তুষার এমনভাবে উড়ছে কিছুই চোখে দেখার উপায় নেই। নিখুঁত সময়। ইভান সামনে, তার পেছনে আলেক্সেই, দিমিত্রি, নিকোলাই আর বাকিরা। মোট বিশজন।
তারা স্কি করে এগিয়ে গেল নিঃশব্দে। বরফের ওপর দিয়ে স্কি করে যাওয়া তাদের কাছে শ্বাস নেওয়ার মতোই সহজ ছিল। ছোটবেলা থেকেই তারা এটা করে আসছে। তুষারঝড়ের মধ্যে তারা ছিল অদৃশ্য ভূতের মতো।
দুই ঘণ্টা পর তারা পৌঁছল জার্মান লাইনের কাছে। সামনে দেখা গেল ট্রেঞ্চ। জার্মান সৈন্যরা আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে বসে আছে। তারা কাঁপছে, একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে উষ্ণতা খুঁজছে। তারা জানে না যে মৃত্যু তাদের ঘিরে ফেলেছে।
ইভান হাত তুলল। সিগন্যাল। সবাই থামল। তারপর ইভান তিনবার আঙুল নাড়ল। তিন। দুই। এক।
পরমুহূর্তেই তুষারঝড় ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো সাইবেরিয়ান যোদ্ধারা। মেশিনগান গর্জে উঠল। গ্রেনেডের আঘাতে ছিটকে গেল জার্মান ট্রেঞ্চ। চারিদিকে শুধু বিস্ফোরণের শব্দ। চিৎকার। হট্টগোল।
জার্মান সৈন্যরা কিছু বুঝে উঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। কিছু সৈন্য পালাতে চেষ্টা করল, কিন্তু বরফের মধ্যে তাদের পা ডুবে যাচ্ছিল। সাইবেরিয়ানরা কিন্তু স্কিতে করে উড়ে যাচ্ছিল।
একজন জার্মান অফিসার হিস্টিরিয়ায় চিৎকার করে উঠল, “Gespenster! Schneegespänster!” ভূত! বরফের ভূত!
কিন্তু তার চিৎকার তুষারঝড়ের গর্জনে হারিয়ে গেল।
আলেক্সেই সেই রাতে প্রথমবারের মতো কাউকে মারল। একজন জার্মান সৈন্য তার দিকে বন্দুক তাক করছিল। আলেক্সেই দ্রুত গুলি করল। জার্মান সৈন্যটা বরফে পড়ে গেল। আলেক্সেই কাছে গিয়ে দেখল ছেলেটার বয়স তার মতোই। হয়তো আঠারো উনিশ। তার পকেট থেকে পড়ে গেল একটা ছবি। তার মা আর ছোট বোনের ছবি।
আলেক্সেইর হাত কাঁপছিল। সে ছবিটা তুলে নিল। তারপর নিজেকে ঝাঁকুনি দিল। এটা যুদ্ধ। এটা বেঁচে থাকার লড়াই। সে যদি গুলি না করত, জার্মান ছেলেটাই তাকে মেরে ফেলত।
পনেরো মিনিটের মধ্যে সবকিছু শেষ হলো। জার্মান পোস্ট ধ্বংস হলো। সাপ্লাই ডিপোতে আগুন লাগিয়ে দিল সাইবেরিয়ানরা। খাদ্য, জ্বালানি, গোলাবারুদ সব পুড়ে গেল।
তারপর তারা আবার অদৃশ্য হয়ে গেল তুষারঝড়ের মধ্যে। জার্মানরা শক্তিবৃদ্ধি করে যখন স্পটে এলো, ততক্ষণে কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুধু পড়ে আছে লাশ আর ধ্বংসস্তূপ।
এভাবেই রাতের পর রাত চলতে লাগল। সাইবেরিয়ান যোদ্ধারা আক্রমণ করত, ধ্বংস করত, অদৃশ্য হয়ে যেত। জার্মান সৈন্যরা তাদের ভয় পেতে শুরু করল। রাতে ঘুমাতে ভয় পেত। কখন যে তুষারঝড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসবে সেই সাদা পোশাকের ভূতেরা, কেউ জানে না।
জার্মান সৈন্যদের মনোবল ভেঙে যেতে শুরু করল। তারা একে অপরকে গল্প বলত সাইবেরিয়ানরা নাকি আসলে মানুষ নয়, তারা বরফের দানব, তাদের মারা যায় না, ঠান্ডা তাদের কিছু করতে পারে না। এভাবে সাইবেরিয়ানদের নিয়ে নানান ভৌতিক কিংবদন্তী বলা শুরু হলো।
হান্স মুলার তার ডায়েরিতে লিখল ডিসেম্বরের সাত তারিখে। “আজ রাতে তারা আবার এসেছিল। আমরা তাদের দেখি না যতক্ষণ না খুব দেরি হয়ে যায়। তারা বরফের মতো সাদা, ভূতের মতো নিঃশব্দ। স্কি পায়ে দিয়ে উড়ে আসে। তুষারঝড়ের মধ্যে হঠাৎ আবির্ভাব হয়, মৃত্যু ছড়িয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। গতকাল তৃতীয় কোম্পানি পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আশিজন! এক রাতেই শেষ। এই Schneegespänster (ভূত বা প্রেতাত্মা) দের হাতে। আমি বাড়ি ফিরতে চাই। আমি মাকে দেখতে চাই।”
কিন্তু সাইবেরিয়ানরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। প্রতিদিন কেউ না কেউ মারা যাচ্ছিল। জার্মান গুলিতে, কামানে, মাইনে। যুদ্ধ-যুদ্ধই। কারো পক্ষপাত করে না।
ডিসেম্বরের দশ তারিখে একটা বড় অপারেশন হলো। পাঁচশো সাইবেরিয়ান স্কি ট্রুপার একসাথে আক্রমণ করল একটা গুরুত্বপূর্ণ জার্মান সাপ্লাই হাবে। এটা ছিল একটা বড় গুদাম যেখানে জমা ছিল তিন ডিভিশনের জন্য খাবার, জ্বালানি, গোলাবারুদ।
রাত তিনটে। তুষারঝড় তখন তুঙ্গে। পাঁচ মিটারের বেশি দুরের কিছুই দেখা যায় না। নিখুঁত পরিস্থিতি।
ইভান, আলেক্সেই, দিমিত্রি তাদের স্কোয়াড নিয়ে বাম দিক থেকে এগোচ্ছিল। নিকোলাই তার স্কোয়াড নিয়ে ডান দিক থেকে। আরো তিনটা স্কোয়াড পেছনে আর সামনে থেকে। পুরো গুদাম ঘেরাও করা হয়েছিল।
জার্মান প্রহরীরা ট্রেঞ্চে বসে আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসেছিল। তারা ঠান্ডায় কাঁপছিল, একে অপরকে গল্প বলছিল বাড়ির, প্রেমিকার, মায়ের। তারা জানত না যে তাদের চারপাশ থেকে মৃত্যু ঘিরে আসছে।
ঠিক তিনটা পনেরোতে সিগন্যাল ফ্লেয়ার ছোঁড়া হলো। আকাশে লাল আলো জ্বলে উঠল। সেই মুহূর্তে চারদিক থেকে শুরু হলো আক্রমণ।
মেশিনগানের গুলি, গ্রেনেডের বিস্ফোরণ, চিৎকার সব মিলিয়ে এক জাহান্নাম সৃষ্টি হলো। জার্মান সৈন্যরা ছুটোছুটি করছিল, বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। অন্ধকার, তুষারঝড়, চারদিক থেকে গুলি।
আলেক্সেই তার স্কোয়াডকে নিয়ে সোজা গুদামের দিকে ছুটল। তাদের কাজ ছিল ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরক পাতা। সে দরজা ভেঙে ঢুকল ভেতরে। দেখল সারি সারি বাক্স। খাবার, ওষুধ, গোলাবারুদ।
“দ্রুত! বিস্ফোরক লাগাও!” সে চিৎকার করল।
দিমিত্রি আর দুজন সৈন্য দ্রুত বাক্সগুলোতে টিএনটি পাততে শুরু করল। দশ মিনিটের মধ্যে সব প্রস্তুত।
“বের হও! বের হও!” আলেক্সেই চিৎকার করল।
তারা দৌড়ে বের হলো। পঞ্চাশ মিটার দূরে গিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল।
বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলো। আগুনের গোলা আকাশে উঠে গেল। তাপ এত বেশি যে পঞ্চাশ মিটার দূর থেকেও অনুভব করা যাচ্ছিল। পুরো গুদাম জ্বলে উঠল।
ইভান দূর থেকে দেখে মুচকি হাসল। “চমৎকার কাজ ছেলেরা। এবার ফিরি।”
কিন্তু সেই মুহূর্তে শোনা গেল গুলির শব্দ। একটা জার্মান স্নাইপার লুকিয়ে ছিল একটা গাছে। সে গুলি করল।
নিকোলাই পেট্রোভিচ বুকে গুলি খেল। বৃদ্ধ সৈন্যটা বরফে পড়ে গেল।
আলেক্সেই চিৎকার করে ছুটে গেল তার কাছে। “নিকোলাই! নিকোলাই!”
নিকোলাই তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে। তুষারপাত হচ্ছিল। বরফের কণা তার মুখে পড়ছিল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি। “ছেলে… জিতে যাও… মস্কোকে বাঁচাও… রাশিয়াকে বাঁচাও…”
তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। রক্ত বরফে ছড়িয়ে পড়ে লাল দাগ তৈরি করছিল সাদা তুষারে।
আলেক্সেই কাঁদছিল। নিকোলাই তার পিতার মতো ছিল। তাকে স্কি শিখিয়েছিল, শিকার শিখিয়েছিল, যুদ্ধ করতে শিখিয়েছিল। এখন সে চলে গেল।
দিমিত্রি এসে আলেক্সেইকে টেনে তুলল। “চলো। আমাদের যেতে হবে। জার্মানরা প্রস্তুতি নিয়ে শীগগিরই আসছে।”
আলেক্সেই নিকোলাইর রাইফেল তুলে নিল। তারপর তাকাল সেই গাছের দিকে যেখানে স্নাইপার লুকিয়ে ছিল। তার চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল। ক্রোধে, বেদনায়।
সে রাইফেল তাক করল। স্থির হাতে। শ্বাস নিল। ছাড়ল। গুলি করল।
জার্মান স্নাইপার গাছ থেকে পড়ে গেল।
“এটা তোমার জন্য, নিকোলাই,” আলেক্সেই ফিসফিস করল।
তারা ফিরে এলো বেসে। সেদিন তারা জিতেছিল। জার্মানদের বিশাল ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু নিকোলাইকে তারা হারিয়েছিল চিরতরে। সাথে আরো দশজন সাইবেরিয়ান সৈন্যকে হারিয়েছিল। বিজয়ের স্বাদ খুব তেতো।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। তাপমাত্রা এখন মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি। জার্মানদের অবস্থা ভয়াবহ। প্রতিদিন হাজার হাজার সৈন্য হিম শীতে আক্রান্ত হচ্ছিল। অনেকের পা কেটে ফেলতে হচ্ছিল। অনেকে রাতেই জমে মারা যাচ্ছিল। তাদের খাবার শেষ, জ্বালানি শেষ, গোলাবারুদ কমে যাচ্ছিল।
আর সাইবেরিয়ানরা প্রতি রাতে আক্রমণ করে যাচ্ছিল। তারা ছিল বরফের রাজ্যের রাজা। শীত তাদের শক্তি দিচ্ছিল, জার্মানদের দুর্বল করছিল।
পনেরো ডিসেম্বর। জেনারেল জুকভ সিদ্ধান্ত নিলেন। এখন সময় এসেছে পাল্টা আক্রমণের। মস্কোকে রক্ষা করা হয়েছে, এখন জার্মানদের পিছু হটাতে হবে।

ভোরের আলো ফোটার আগে শুরু হলো কামানের গর্জন। হাজার হাজার কামান একসাথে গর্জে উঠল। আকাশ লাল হয়ে গেল। রকেট আর শেল জার্মান পজিশনে বৃষ্টির মতো পড়তে লাগল।
তারপর তুষার চাদর ভেদ করে এগিয়ে এলো সাইবেরিয়ান ডিভিশনগুলো। স্কিতে চড়ে, ট্যাংকে চড়ে, পায়ে হেঁটে। তারা ছিল অজেয় এক বাহিনী।
ইভানের ইউনিট একটা গ্রামের দিকে এগোচ্ছিল। জার্মানরা প্রচণ্ড প্রতিরোধ করছে। মেশিনগানের গুলি বরফে ছিটকে পড়ছে। কামানের গোলা বিস্ফোরিত হচ্ছে।
“এগিয়ে চলো!” ইভান চিৎকার করল। “পেছনে তাকিও না! এগিয়ে চলো! মস্কোর জন্য! স্ট্যালিনের জন্য! রাশিয়ার জন্য!”
আলেক্সেই দৌড়াচ্ছিল। তার পাশে দিমিত্রি। তারা একটা বাড়ির পেছন থেকে ঘুরল। সামনে দেখল একটা জার্মান মেশিনগান পোস্ট।
আলেক্সেই গ্রেনেড খুলল। ছুঁড়ল। নিখুঁত নিশানা। গ্রেনেড মেশিনগান পোস্টে গিয়ে পড়ল।
বিস্ফোরণ। ধোঁয়া। প্রতিরোধ থেমে গেল।
তারা এগিয়ে গেল। গ্রাম দখল করল। জার্মানরা পিছু হটছিল।
এভাবেই দিনের পর দিন চলল। সাইবেরিয়ানরা এগিয়ে যেতে লাগল। জার্মানরা পিছু হটতে লাগল। যে সেনাবাহিনী পুরো ইউরোপ দখল করেছিল, তারা এখন পালাচ্ছে রুশ শীত আর সাইবেরিয়ান যোদ্ধাদের থেকে বাঁচতে।

ক্রিসমাসের আগের রাত। একটা পরিত্যক্ত জার্মান বাঙ্কারে ইভানের দল রাত কাটাচ্ছিল। তারা জার্মানদের ফেলে যাওয়া কিছু খাবার খুঁজে পেল। রুটি, সসেজ, এমনকি একটা চকলেটও।
আলেক্সেই চকলেটটা খুলল। স্বাদ নিল। কতদিন এমন কিছু খায়নি। তার মনে পড়ল বাড়ির কথা। মায়ের হাতের রান্না। বোনের হাসি।
দেয়ালে একটা ছবি ঝুলছিল। একজন জার্মান সৈন্য তার স্ত্রী আর ছোট্ট মেয়ের সাথে। সুখী একটা ছবি। ছবির পেছনে লেখা ছিল জার্মানিতে “Meine Familie. Ich liebe euch.” আমার পরিবার। আমি তোমাদের ভালোবাসি।
ইভান ছবিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। “যুদ্ধ সবাইকেই কাঁদায়। জার্মান, রুশ, সবাই। আমরা সবাই মানুষ।”
কিন্তু তারপরই তার মনে পড়ল সেই জ্বলন্ত রুশ গ্রাম। সেই কাঁদতে থাকা মা যার সন্তানকে জার্মান সৈন্যরা মেরে ফেলেছিল। সেই বৃদ্ধ যাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
“জার্মানরাই এই যুদ্ধ শুরু করেছিল,” সে ছবিটা ফেলে দিল। “তারাই আমাদের দেশে আক্রমণ করেছিল।”
দিমিত্রি বলল, “আমরা তাদের ঘর থেকে বের করে দিচ্ছি। শিগগিরই তারা চলে যাবে। আর কখনো ফিরবে না।”
জানুয়ারি ১৯৪২। জার্মানরা এখন মস্কো থেকে দুইশো পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। তাদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। Wehrmacht প্রথমবারের মতো বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
হিটলার ক্রোধে পাগল হয়ে গিয়েছিলো। তিনি তার জেনারেলদের বরখাস্ত করলেন। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। শীত এসে গিয়েছিল। আর শীতের সাথে এসেছিল সাইবেরিয়ার ভূতেরা।
ফেব্রুয়ারির এক সকাল। মস্কোর রেড স্কোয়ার। বিজয় কুচকাওয়াজ হচ্ছে। সাইবেরিয়ান ডিভিশনগুলো মিছিলে হাঁটছে। জনতা করতালি দিচ্ছে, ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে, কাঁদছে আনন্দে।
ইভান আর আলেক্সেই হাঁটছে পাশাপাশি। তাদের ইউনিফর্মে মেডেল। কিন্তু তাদের চোখে এক গভীর ক্লান্তি। তারা অনেক কিছু দেখেছে। অনেক বন্ধুকে হারিয়েছে।
একজন বৃদ্ধ মহিলা এগিয়ে এলেন। তিনি আলেক্সেইর হাত ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তোমরা আমাদের বাঁচিয়েছো বাছারা। তোমরা রাশিয়া বাঁচিয়েছো। ঈশ্বর তোমাদের রক্ষা করুন।”
আলেক্সেইর চোখেও জল এলো। সে বলল, “মা, আমরা শুধু আমাদের কর্তব্য করেছি। মাতৃভূমি ডেকেছিল, আমরা এসেছি।”
স্ট্যালিন নিজে এলেন তাদের সাথে দেখা করতে। “কমরেডস,” তিনি বললেন, “তোমরা মাতৃভূমির রক্ষাকর্তা। ইতিহাস তোমাদের মনে রাখবে। সাইবেরিয়ার বীর সন্তানেরা যারা নয় হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এসে মস্কো বাঁচিয়েছ। যারা প্রমাণ করেছ যে হিটলার অজেয় নয়। তোমাদের সাহস, তোমাদের ত্যাগ কখনো ভোলা হবে না।”
সেই রাতে ইভান আর আলেক্সেই তাঁবুতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। চাঁদ উঠেছে। তারা ভাবছিল সেই সব বন্ধুদের কথা যারা আর ফিরবে না। নিকোলাই, সের্গেই, দিমিত্রি হাজার হাজার নাম। হাজার হাজার মুখ।
“তুই মনে করিস তারা জানত এটা এতটা কঠিন হবে?” আলেক্সেই জিজ্ঞেস করল।
ইভান একটু ভাবল। “জানত। কিন্তু তবুও তারা এসেছিল। কারণ মাতৃভূমি ডেকেছিল। রাশিয়া ডেকেছিল। আর আমরা রুশরা যখন আমাদের মাটি রক্ষার জন্য লড়ি, তখন আমরা অজেয় হয়ে উঠি। এটাই আমাদের শক্তি। এটাই রাশিয়া।”
আলেক্সেই চুপ করে শুয়ে রইল। তার মনে পড়ছিল সেই প্রথম রাতের কথা যখন তারা ট্রেনে উঠেছিল ভ্লাদিভোস্তক থেকে। তখন সে ভয় পেয়েছিল। এখন সে আর ভয় পায় না। সে একজন যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। একজন সাইবেরিয়ান ভূত।
কিন্তু যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এটা শুধু শুরু। সামনে আছে স্ট্যালিনগ্রাদ। সামনে আছে বার্লিন পর্যন্ত লম্বা যাত্রা।
কিন্তু আজ রাতে তারা বিশ্রাম নেবে। কারণ আজ তারা জিতেছে। তারা মস্কো বাঁচিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে যে রাশিয়াকে জয় করা যায় না।
দূরে কোথাও একটা নেকড়ে ডাকল। আলেক্সেই শুনল। মুচকি হাসল। সাইবেরিয়ার নেকড়ে। তার দেশের শব্দ।
সে চোখ বন্ধ করল। ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে দেখল সে বাড়ি ফিরে গেছে। তার মা তাকে জড়িয়ে ধরছে। তার বোন হাসছে। সব কিছু আবার ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু ভোরে যখন ঘুম ভাঙল, সে আবার সৈন্য। আবার যোদ্ধা। আবার সাইবেরিয়ার বরফের প্রেতাত্মা। যুদ্ধ চলবে। তাকে লড়ে যেতে হবে। মাতৃভূমির জন্য। রাশিয়ার জন্য। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
আজও যখন রাশিয়ায় শীতের ঝড় আসে, বৃদ্ধরা গল্প বলেন সেই সাইবেরিয়ান যোদ্ধাদের গল্প। যারা ছিল তুষারের প্রেতাত্মা। যারা মস্কোকে বাঁচিয়েছিল। যারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন শীত, সাহস আর ত্যাগ একসাথে মিলে কীভাবে ইতিহাস বদলে দেয়।
ইতিহাসের গল্প/নয়াখবর
